প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাংলার প্রাকৃতিক সম্পদ, উর্বর ভূমি, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের আকর্ষণে বহু বিদেশি পরিব্রাজক ও পর্যটক বাংলায় আগমন করেন। তাঁদের ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে তৎকালীন বাংলার সমাজ, অর্থনীতি, ধর্ম ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে মূল্যবান ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়।
গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজদরবারে অবস্থান করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ ইন্ডিকা-তে মৌর্য যুগের প্রশাসন, সমাজ ও অর্থনৈতিক অবস্থার বর্ণনা পাওয়া যায়। যদিও বাংলায় তাঁর সরাসরি আগমনের সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই, বৃহত্তর মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে বাংলার পরিস্থিতি সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়।
চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষু ফা-হিয়েন গুপ্ত যুগে বাংলায় ভ্রমণ করেন। তিনি তাম্রলিপ্ত বন্দরের উল্লেখ করেছেন এবং বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার, অহিংস জীবনধারা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন। তাঁর বিবরণ থেকে জানা যায়, সে সময় বাংলায় বৌদ্ধ বিহার ও সন্ন্যাসীর সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য।
আরেক চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং সপ্তম শতকে বাংলায় আগমন করেন। তিনি হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক ছিলেন এবং নালন্দা মহাবিহারে অধ্যয়ন করেন। তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে বাংলার প্রশাসন, শিক্ষা ও ধর্মীয় অবস্থার সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়।
মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম পরিব্রাজক ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় আসেন। তিনি সিলেট, সোনারগাঁও ও চট্টগ্রাম অঞ্চল ভ্রমণ করেন এবং বাংলার নদীপথ, বন্দর, বাজার ব্যবস্থা ও সুফিবাদের প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দেন। তাঁর লেখায় শাহজালাল (র.)-এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখিত।
চীনা পরিব্রাজক ই-সিং সপ্তম শতকে বাংলায় ভ্রমণ করে এখানকার খাদ্যাভ্যাস, কৃষিকাজ ও লোকজ বিশ্বাসের বর্ণনা দিয়েছেন। পরে মা হুয়ান (১৫শ শতক) জেং হি–এর অভিযানের সঙ্গী হিসেবে বাংলায় আসেন এবং তাঁর বিবরণে বাংলার সমাজ, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির বস্তুনিষ্ঠ চিত্র পাওয়া যায়।
এ ছাড়া ইতালির নিকালো মানুচ্চি, গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমি, পর্তুগিজ দুয়ার্তে বারবোসা, ইংরেজ রালফ ফিচসহ বহু বিদেশি পর্যটক বাংলায় এসে এই অঞ্চলের সমৃদ্ধির কথা তুলে ধরেছেন। তাঁদের বিবরণ প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাস রচনায় অমূল্য উৎস হিসেবে বিবেচিত।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মেগাস্থিনিস ছিলেন একজন প্রাচীন গ্রীক ইতিহাসবিদ, কূটনীতিবিদ এবং হেলেনিস্টিক যুগে ভারতীয় নৃতত্ত্ববিদ ও অনুসন্ধানকারী। তিনি প্রাচীন গ্রিস এর একজন পর্যটক এবং ভূগোলবিদ। সিরিয়ার রাজা প্রথম সেলুকাসের দূত হিসেবে ভারতীয় রাজা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এর রাজদরবারে আসেন। তিনি যখন ভারতে আসেন তখন চন্দ্রগুপ্তের রাজদরবার ছিল ভারতের পাটালিপুত্র নামক স্থানে।
বিখ্যাত গ্রন্থ: তাঁর লিখিত বিশ্ববিখ্যাত বইটির নাম 'ইন্ডিকা' (Indica)। যদিও মূল বইটি বর্তমানে বিলুপ্ত, তবে আরিয়ান ও স্ট্রাবোর মতো পরবর্তী গ্রীক লেখকদের উদ্ধৃতি থেকে এর তথ্যগুলো উদ্ধার করা হয়েছে।
পরিচয়: তিনি ছিলেন প্রাচীন গ্রীক ইতিহাসবিদ ও কূটনীতিবিদ। তাঁকে 'ভারতীয় ইতিহাসের জনক' (Father of Indian History) বলা হয়।
আগমনকাল: ৩৩৫-৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে তিনি সিরিয়ার রাজা প্রথম সেলুকাস নিকেটরের দূত হিসেবে ভারত ভ্রমণ করেন।
রাজদরবার: তিনি মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজদরবারে এসেছিলেন।
সপ্ত-জাতিতত্ত্ব: মেগাস্থিনিস তাঁর বর্ণনায় তৎকালীন ভারতীয় সমাজকে ৭টি শ্রেণিতে বা ভাগে বিভক্ত বলে উল্লেখ করেছেন।
এগুলো হলো:
- দার্শনিক
- কৃষক (সবচেয়ে বড় শ্রেণি)
- পশুপালক ও শিকারি
- কারিগর ও শিল্পী
- যোদ্ধা বা সামরিক বাহিনী
- পরিদর্শক বা গুপ্তচর।
- অমাত্য বা মন্ত্রণাদাতা।
পৌর প্রশাসন: পাটলিপুত্র শহরের শাসন পরিচালনার জন্য ৩০ জন সদস্যের একটি পরিষদ ছিল, যারা ৬টি কমিটিতে (প্রতিটিতে ৫ জন) বিভক্ত হয়ে কাজ করত।
দাস প্রথা: তাঁর মতে, ভারতে কোনো দাস প্রথা ছিল না। যদিও আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, গ্রীক দাসদের তুলনায় ভারতীয় দাসদের অবস্থা অনেক ভালো হওয়ায় তিনি হয়তো তাদের পার্থক্য করতে পারেননি।
নামকরণ: তিনি পাটলিপুত্র শহরকে 'পালিবোথরা' (Palibothra) নামে বর্ণনা করেছিলেন।
ধর্মীয় উল্লেখ: তিনি তাঁর বর্ণনায় 'ডায়োনিসাস' (শিব) এবং 'হেরাক্লেস' (কৃষ্ণ) নামক দুই দেবতার উল্লেখ করেছিলেন
ফা-হিয়েন চীনের শানসি প্রদেশে আনুমানিক ৩৩১ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম ছিল কুঙ্গ। বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেওয়ার পর ফা-হিয়েন রাখা হয়েছিল। তিনি চীন দেশের পরিব্রাজক ছিলেন। ৩৯৯ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম দিকে চীনের রাজধানী চ্যাংগান থেকে ভারতের দিকে রওনা হয়েছিলেন। চ্যাংগান আর পুরনো নাম ছিল হাইফেং এবং পরবর্তীতে নামকরণ হয় সিয়ান।
বিখ্যাত গ্রন্থ: ফা-হিয়েন রচিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটির নাম 'ফো-কু-কি' (Fo-Kwo-Ki), যার অর্থ হলো 'বৌদ্ধ দেশগুলোর বিবরণ'।
পরিচয়: তিনি ছিলেন ভারতে আসা প্রথম চৈনিক বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী।
আগমনকাল: তিনি ৩৯৯ খ্রিস্টাব্দে চীন থেকে যাত্রা শুরু করেন এবং প্রায় ৪০০-৪১১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে অবস্থান করেন।
ভারতে আসার : তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল গৌতম বুদ্ধের পবিত্র স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো দর্শন করা এবং বৌদ্ধ বিনয় বিধি বা 'বিনয় পিটক'-এর মূল পান্ডুলিপি সংগ্রহ করা।
ভারত সম্পর্কে বর্ণনা: তিনি তৎকালীন মগধকে একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পাটলিপুত্র শহর সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত লিখেছেন এবং সেখানে তিনি ৩ বছর সংস্কৃত ভাষা শিখেছিলেন। তৎকালীন শাসনব্যবস্থার প্রশংসা করে তিনি বলেন যে, সেই সময় অপরাধের শাস্তি হিসেবে মূলত জরিমানা করা হতো এবং মৃত্যুদণ্ড বা শারীরিক নির্যাতন খুব একটা ছিল না।
তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে ভারতবাসী ছিল নিরামিষাশী এবং সমাজে মদ্যপান বা পেঁয়াজ-রসুনের প্রচলন ছিল না।
ভ্রমণ পথ: তিনি মধ্য এশিয়া হয়ে স্থলপথে ভারতে আসেন এবং ফেরার সময় তাম্রলিপ্ত (বর্তমান মেদিনীপুর) থেকে সমুদ্রপথে সিংহল ও জাভা হয়ে চীনে ফিরে যান
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মা হুয়ান ছিলেন চীনা পরিব্রাজক। তিনি ১৪০৬ সালে গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের আমলে উপমহাদেশে আসেন।
পরিচয়: মা-হুয়ান ছিলেন একজন বিখ্যাত চীনা পর্যটক, লেখক এবং অনুবাদক। তিনি ধর্মীয়ভাবে একজন চীনা মুসলিম ছিলেন।
কার রাজত্বকালে আসেন: মা-হুয়ান যখন বাংলায় আসেন, তখন বাংলার সুলতান ছিলেন ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (কারো মতে জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ)।
বিখ্যাত গ্রন্থ: তাঁর লিখিত ভ্রমণকাহিনী বা বইয়ের নাম 'ইং-ইয়াই শেং-লান' (Ying-yai Sheng-lan), যার অর্থ 'সমুদ্র তীরের সামগ্রিক জরিপ'।
গুরুত্ব: তাঁর লেখা থেকে তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বর্ণনা পাওয়া যায়। বাংলার সমাজ ও অর্থনীতি নিয়ে বর্ণনা:তিনি বাংলাকে একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং জনবহুল দেশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
রেশম ও মসলিন: তিনি তৎকালীন বাংলায় রেশম চাষ এবং উচ্চমানের মসলিন কাপড় তৈরির কথা উল্লেখ করেছেন।
কাগজ শিল্প: মা-হুয়ানের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, সেই সময়ে বাংলায় ছাল জাতীয় উপাদান থেকে এক ধরণের সাদা কাগজ তৈরি হতো।
মুদ্রা: তিনি বাংলায় রৌপ্য মুদ্রা বা 'টাকা' এবং ক্ষুদ্র লেনদেনের জন্য 'কড়ি'র ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন।
সম্পৃক্ততা: তিনি চীনের মিং রাজবংশের বিখ্যাত অ্যাডমিরাল ঝেং হে-র (Zheng He) নৌ-অভিযানের দোভাষী হিসেবে ভারত ও বাংলা ভ্রমণ করেছিলেন।
ইবনে বতুতা ছিলেন মুসলিম পরিব্রাজক। তিনি ১৩০৪ সালে মরোক্কোয় জন্মগ্রহণ করেন এবং মোহাম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে ১৩৩৩ সালে ভারতবর্ষে আগমণ করেন। তিনি বাংলায় আসেন ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের আমলে। ইবনে বতুতা প্রথমে বিদেশি পর্যটক হিসেবে বাঙ্গালা শব্দ ব্যবহার করেন। জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক দ্রব্যের প্রাচুর্য ও স্বল্পমূল্য আর মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য বতুতাকে আকৃষ্ট করলেও এ দেশএর আবহাওয়া তার পছন্দ হয়নি। এজন্য তিনি বাংলার নামকরণ করেন ধনসম্পদপূর্ণ নরক। ইবনে বতুতার কিতাবুল রেহালা নামক গ্রন্থে বাংলার অপরূপ সৌন্দর্যের বর্ননা পাওয়া যায়।
- পরিচয়: তিনি ছিলেন মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ মুসলিম পর্যটক এবং একজন প্রখ্যাত মরোক্কান পন্ডিত। তাঁকে 'পর্যটকদের রাজপুত্র' বলা হয়।
- বিখ্যাত গ্রন্থ: তাঁর ভ্রমণকাহিনীর নাম 'কিতাব-উল-রেহলা' (Kitab-ul-Rihla)।
- ভারত আগমন: ১৩৩৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বকালে ভারতে আসেন।সুলতান তাঁকে দিল্লির 'কাজী' (বিচারক) হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। সুলতান তাঁকে তাঁর দূত হিসেবে চীনে পাঠিয়েছিলেন।
- বাংলা ভ্রমণ: তিনি ১৩৪৫-১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় আসেন। সেই সময় সোনারগাঁওয়ে স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের রাজত্ব চলছিল।তিনি বাংলাকে তাঁর বইতে 'দোযখপুর-আয-নিয়ামত' (নেয়ামতপূর্ণ নরক) বলে অভিহিত করেছেন (প্রচুর সম্পদ কিন্তু আবহাওয়া ও পরিবেশগত কারণে)।
- হযরত শাহজালাল (র.) এর সাথে সাক্ষাৎ: তিনি সিলেটে এসে বিখ্যাত সুফি সাধক হযরত শাহজালাল (র.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
- বাংলার সামাজিক বর্ণনা: তাঁর বর্ণনায় তৎকালীন বাংলায় দাস-দাসী কেনাবেচা এবং দ্রব্যমূল্যের সস্তা হওয়ার কথা উল্লেখ আছে (যেমন—একটি সুস্থ মোরগ এক দিরহামের ১/৮ অংশ দামে পাওয়া যেত)।
- ভ্রমণের বিস্তার: তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে আফ্রিকা, এশিয়া এবং ইউরোপের বিশাল অংশ ভ্রমণ করেছিলেন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
Read more